সত্যজিতের মেঘদূতেরা

এই মুহূর্তে সত্যজিৎ রায়ের জনঅরণ্য (১৯৭৫) ছবিটির নায়ক সোমনাথের কথাই মনে পড়ছে। সোমনাথ ইতিহাসের ছাত্র ছিলেন এবং এটাই সম্ভবত ইতিহাসের অনন্য কৌতুক যে, সত্তর দশকে কোলকাতা শহরের প্রখ্যাত লোডশেডিং তার ডিগ্রিটিকে অবান্তর করে দিয়েছিল। দৃশ্যের এইটুকু ভাষ্য— আমার মতে— সত্যজিৎ রায়ের পক্ষে চূড়ান্ত রাজনৈতিক বক্তব্য। কিংবা মনটাকে সত্যজিতের সৃষ্টির সঙ্গে আরেকটু টেনে যদি ষাটের দশকে…

জীবনাধিক জীবন

ছবিটির দিকে তাকাই এবং আবিষ্কার করি দেবব্রত বিশ্বাসকে। শিশির মঞ্চে পশ্চিমবঙ্গ সরকারের এই সংবর্ধনা অনুষ্ঠানে স্নেহাংশু আচার্য, কনক বিশ্বাস ও অন্যান্যদের সঙ্গে তাঁর এই বসে থাকার ভঙ্গিমাই আমাদের কাছে মেলে ধরে দেবব্রত বিশ্বাসের যাবতীয় ইশতেহার। এই ইশতেহার কারিগরের নয়; বরং দ্রষ্টার বিশৃঙ্খলা ও কিমিতি, মৃত্যু ও শূন্যতা, পাপ ও প্রজ্ঞান একই সুরে নিবেদিত হয়েছে অসীমের…

‘মহানগর’: দেশভাগের প্রচ্ছন্ন পাঠ

“A women’s place is in the home”— সত্যজিৎ রায়ের মহানগর (১৯৬৩) চলচ্চিত্রে সুব্রত মজুমদারের [অভিনয়: অনিল চট্টোপাধ্যায়] এই সংলাপ বরাবরই সত্যজিৎ আলোচনায় তৎকালীন প্রেক্ষাপটের পুরুষতান্ত্রিক মানসিকতা হিশেবে আলোচিত হয়েছে। এই আলোচনার যৌক্তিকতাও আছে। কিন্তু পঞ্চাশের দশকের কোলকাতার পটভূমিতে নির্মিত এই ছবিতে দেশভাগের যে প্রচ্ছন্ন পাঠ— তার ইঙ্গিতও বহন করে ছবিটির শুরুর দিকেই সুব্রত মজুমদারের এই…

আমাদের প্রত্যাখ্যানের মাতৃভাষা

কী এক অলৌকিক সমাপতন! ১৯৬৭- এর যে হেমন্তের দিনে আজাদ আবুল কালাম জন্ম নিচ্ছেন স্বাধীনতা সংগ্রামমুখর বাঙলাদেশে, প্রায় তখনই গাব্রিয়েল গার্সিয়া মার্কেস তাঁর যাদু-বাস্তবতা ছড়িয়ে দিচ্ছেন মাসন্দো শহরের বুয়েন্দিয়া পরিবারের সাত প্রজন্মের মধ্যে। আজাদ আবুল কালাম তাহলে নিঃসঙ্গতার একশ বছরের  সমবয়ষ্ক! আর তাই হয়তো হোসে আর্কেদিয়া ও উরসুলা বুয়েন্দিয়ার নতুন গন্তব্যে যাত্রা বৃত্তান্তের মতোই আজাদ…

জহির রায়হান— আমার শক্তি, আমাদের ত্রাতা

আমরা আরেকবার জহির রায়হানের মুখোমুখি দাঁড়াতে পারি; যাবতীয় ক্ষোভ, দ্রোহ, স্বপ্ন আর অভিমানের কার্নিভ্যাল নিয়ে আমরা জহির রায়হানের কাছে নিবেদন করতে পারি আমাদের সময়ের প্রয়োজন। ইতিহাসের ক্লাশরুমে আমরা জেনেছি, ব্ল্যাকবোর্ডে নয়; বরং চোখ রাখতে হয় ইতিহাস নির্মাণ-শ্রমিকদের চোখে, জেনে নিতে হয় রক্ত আর রক্তজবার পার্থক্য। নয় মাসের রক্তক্ষয়ী মুক্তি সংগ্রামের ভেতরে তেইশ বছরের শোষণ-বঞ্চনার যে…

হৃদয় ও রাজনীতির কোলাজ

মাত্র আটটি চলচ্চিত্র- এরপর তিনি মহাপ্রস্থানের পথে এগিয়েছেন। মাত্র আটবার কড়া নাড়ায় মহাকাল তাঁকে দরজা খুলে দেয়; এরপর তিনি প্রবেশ করেন অনন্ত শূন্যলোকে- অর্থহীন সময়কে করে তোলেন অর্থপূর্ণ শুভ্র অথবা কালোত্তীর্ণ জীবনের এপিটাফ। এরকম আশ্চর্য ব্যতিক্রম অবশ্য ঋত্বিক ঘটক ছাড়াও এসেছিলো আন্দ্রেই তারকোভস্কির সময়ে- তাঁর সমাপ্ত চলচ্চিত্রের সংখ্যা সাত। আজ মাঝে মাঝে মনে হয় এঁরা…

শুভ জন্মদিন মহানায়ক

বেঁচে থাকলে আজ তিনি পঁচাশি বছরে পা দিতেন। তখন কেমন দেখাতো তাঁকে? তিনি কী বুড়ো হয়ে যেতেন? চুলে পাক ধরতো? শরীরে মেদের উপস্থিতি নিয়েও পর্দার সামনে দাঁড়িয়ে নিরন্তর আওড়াতেন নায়ক কিংবা নায়িকার পিতার সংলাপ? তারপর স্যুটিং ফ্লোরের ব্যস্ততা সেরে বাড়ি ফিরতেন। ক্লান্তি-শ্রান্তি নিয়ে শরীর এলিয়ে দিতেন শোবার ঘরের ইজি চেয়ারে। চোখ আলতো বুজে আসতো- অমনি…

মিশুক মুনীর: তুমি রবে নীরবে

এমন একটি লেখা লেখার ইচ্ছে আমার ছিলো না। নিঃসঙ্গ বাতায়নের সাথে গুবাক তরুর সারির কথোপকথন আর কখনো হবে না। এ-ও এক ট্র্যাজিডি- গ্রীক ট্র্যাজিডির সাথে সামঞ্জস্য; কেবল ভাগ্য দ্বারা নিয়ন্ত্রিত হয়- কিংবা এরও বাইরের কিছু। আমি জানি না, ক্যামেরার কোন অ্যাঙ্গেলে কথা বলতে ভালোবাসতেন আশফাক মুনীর মিশুক। জীবনের ভিউ ফাইন্ডারে চোখ রেখে তিনি কী কোনোদিন…

মিশুক মুনীর ও তারেক মাসুদ: নিঃসঙ্গ সময়ের সারথি

এমন একটি লেখা লেখার ইচ্ছে আমার ছিলো না। নিঃসঙ্গ বাতায়নের সাথে গুবাক তরুর সারির কথোপকথন আর কখনো হবে না। এ-ও এক ট্র্যাজিডি- গ্রীক ট্র্যাজিডির সাথে সামঞ্জস্য; কেবল ভাগ্য দ্বারা নিয়ন্ত্রিত হয়- কিংবা এরও বাইরের কিছু। আমি জানি না, ক্যামেরার কোন অ্যাঙ্গেলে কথা বলতে ভালোবাসতেন আশফাক মুনীর মিশুক। জানি না সেলুলয়েডের সাথে কেমন প্রেম ছিলো তারেক…

নির্বাক হলেন প্রথম সবাক বাঙলা চলচ্চিত্রের শিল্পী আমিনুল হক

ফিল্ম  রিভিউ ম্যগাজিনে একবার একটি নিবন্ধ ছাপা হয়েছিলো- যার একটি অংশের বাঙলা তরজমা করলে দাঁড়ায়- পরিচালক অনেকাংশেই চলচ্চিত্রের মূল-কাঠামোতে দৃষ্টি রাখেন, এতে ছোটো ছোটো অনেক ক্ষেত্রে দৃষ্টি দেয়া তার পক্ষে সম্ভব হয় না। ওই কাজটি একজন দক্ষ অভিনয়-শিল্পী করে থাকেন। এই জাতীয় অভিনয় শিল্পীরাই পরিচালকের ফরমায়েশ পেরিয়ে আরও কয়েক কদম এগিয়ে আসেন- এবং কার্যতই এতে…

আমার ভাষার চলচ্চিত্র

বনে আছে দ্বন্দ্বের বিন্যাস, নাগরিকতার সঙ্গে লৌকিক জীবনের। কোনো মানুষই ঠিক সে-অর্থে অখণ্ড নয়, প্রত্যেকের মধ্যেই আছে অপূর্ণতা। এ অপূর্ণতাকে প্রেক্ষণবিন্দুতে রেখেই শিল্পসৃষ্টি আর সেই সৃষ্টিকে ধারণ করা। বৃহৎ অর্থে শিল্পের এ বিশাল আকাশ জুড়ে থাকা রঙধনুর সবচেয়ে উজ্জ্বল রঙটি হয়তো চিহ্নিত করা যাবে না, কিন্তু ভাবনার পরিসীমাটা যদি বাঙালি সমাজ আর বাঙালি মধ্যবিত্তের মানসপট…