আমাদের অন্ধত্বযাত্রার সূচকসমূহ

একসময় বিপ্লব ছিল জনগণের উৎসব; আমাদের কৈশোরে বিপ্লবের আরেক নাম ছিল মাধবীলতা। আজকের অধ্যাপক-অধ্যুষিত শিক্ষিত পৃথিবীতে বিপ্লবের চারণভূমি হলো ফেসবুক। লাইক-কমেন্ট-শেয়ারের আড়াল থেকে ফেসবুকে এখন বিপ্লব উঁকি দেয় পদ্মপলাশলোচনে। আমাদের অগ্রজ প্রজন্ম জীবনের সান্ত্বনা থেকে শান্তি—সবই খুঁজে পেয়েছিলেন রামমোহন থেকে রবীন্দ্রনাথে, শক্তি চট্টোপাধ্যায় থেকে শামসুর রাহমানে; জীবন জিজ্ঞাসাকে তাঁরা সমর্পন করেছিলেন বিজ্ঞান-সমর্থিত যুক্তিবাদে। হোসেন মিয়ার…

শহিদজননী: বাঙালির কোমল গান্ধার

কী অপূর্ব এই স্মরণমুহূর্ত! চারপাশের বেকায়দা সময়ে আমাদের হাবা যৌবন যখন গতপ্রায়, তখনই পৌরাণিক ফেরেশতার মতো ক্যালেন্ডারে নেমে আসে তেসরা মে—শহিদ জননী জাহানারা ইমামের ৯৫তম জন্মবার্ষিকী—আমাদের স্থানাঙ্ক খুঁজে পাওয়ার দিন। কতগুলো নিবিড় বিষন্নতা আমাদের অলৌকিক শুভকামনার সঙ্গে উড়ে যায় তাঁর দিকে—তিনি গ্রহণ করেন, অথবা করেন না; কারণ তিনি তো জানেন—শহিদ রুমীর মতো আসমুদ্রহিমাচল হৃদয় আমাদের…

১৬ আগস্ট ১৯৭৫: কী বলেছিল সেদিনের গণমাধ্যম?

পনেরোই আগস্ট ১৯৭৫। এক ঘোর কৃষ্ণপক্ষ নেমে এসেছিল বাঙলাদেশের বুকে। জাতির জনককে সপরিবারে হত্যার যে নারকীয় ঘটনা সেদিন ঘটেছিল, তার নজির পৃথিবীর ইতিহাসে বিরল। কিন্তু পঁচাত্তর-পরবর্তী সময় থেকেই বাঙলাদেশে সবচেয়ে প্রচলিত কথা হচ্ছে, “কতিপয় বিপথগামী সেনাসদস্য বঙ্গবন্ধুকে হত্যা করেছিল।” সন্দেহ নেই, এ কথাটির মাঝেই রয়েছে একটি বড়ো রকমের ফাঁকি। কারণ, সামরিক-বেসামরিক প্রশাসনের উর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষ, বেতার…

বাংলাদেশজুড়ে ছড়িয়ে গেছে শাহবাগ

আজ থেকে দশ বছর আগে- ২০১৩ সালের ৫ ফেব্রুয়ারি- সব যুদ্ধাপরাধীকে সর্বোচ্চ শাস্তি ও তাদের রাজনৈতিক সংগঠন জামায়াত-শিবিরের রাজনীতি নিষিদ্ধের দাবিতে এক ঐক্যবদ্ধ গণআন্দোলনের সূচনা হয়েছিল শাহবাগের প্রজন্ম চত্বরে। ১৯৭১ সালের মহাকাব্যিক মুক্তিযুদ্ধে বাংলার মানুষের বিরুদ্ধে বর্বর পাকিস্তান সেনাবাহিনীর পরিচালিত জেনোসাইডে যে বাঙালি কুলাঙ্গাররা প্রত্যক্ষভাবে সম্পৃক্ত হয়েছিল, ধ্বংস করে দিতে চেয়েছিল বাংলার নৃতাত্ত্বিক, সাংস্কৃতিক ও…

স্বাধীনতাসংগ্রাম: উত্তর প্রজন্মের উপলব্ধি

মহান মুক্তিসংগ্রামের প্রায় দুই দশক পর জন্ম নেওয়া প্রজন্মের একজন যখন স্বাধীনতাসংগ্রাম-সম্পর্কিত উপলব্ধির বয়ান লিপিবদ্ধ করতে বসে; তখন কেবল সময়ের কারণেই তার ব্যাসার্ধ যায় বেড়ে, পরিধি হয়ে পড়ে বিস্তৃত। তার ওপর সে প্রজন্ম বেড়ে উঠেছিল এমন একসময়ে, যখন রাষ্ট্রজুড়ে রাজনীতির নামে চলছিল পুতুলের কুচকাওয়াজ। কিন্তু মুক্তিসংগ্রামের অমোঘ ইতিহাস তো আমাদের পরিচয়জ্ঞাপক একমাত্র অঙ্গুরীয়। রাজা দুষ্মন্ত…

ফেইসবুক অ্যালগরিদম ও কমিউনিটি স্ট্যান্ডার্ড: প্রেক্ষিত বাংলাদেশ

গত দুই দশকেরও কম সময়ে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেইসবুকে যে সংখ্যক ব্যবহারকারী সক্রিয় হয়েছেন, ডিজিটাল দুনিয়ায় তা এক বিস্ময়। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমগুলো সব শ্রেণির মানুষকে কথা বলার বা মত প্রকাশের সুযোগ করে দিয়েছে— এ বিষয়ে কোনো সন্দেহ নেই। একই সঙ্গে তাদের নিজস্ব বিধি-বিধান আর কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক অ্যালগরিদম কোথাও না কোথাও মত প্রকাশের ক্ষেত্রে বৈষম্য সৃষ্টি…

স্বাধীনতার পঞ্চাশ বছর: প্রকৃত মধ্যবিত্তের সন্ধানে

বাঙলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রামেরও প্রায় ছিয়াশি বছর আগে ব্রিটিশ আমলাদের উদ্যোগে গড়ে উঠেছিল ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেস। ইংরেজি শিক্ষায় শিক্ষিত বিশ্ববিদ্যালয় গ্র্যাজুয়েটদের নিয়ে গঠিত এই প্রতিষ্ঠানটির মাধ্যমে ব্রিটিশ সরকার ভারতীয় জনগণকে অপ্রত্যক্ষভাবে রাজনীতিতে সম্পৃক্ত করার উদ্যোগ নিয়েছিল। নব-প্রতিষ্ঠিত সেই সংগঠনের তরুণ নেতৃত্বের উদ্দেশে ব্রিটিশ আমলা অ্যালেন অক্টেভিয়ান হিউম একটি চিঠিতে লিখেছিলেন— “এদেশের শিক্ষিত মধ্যবিত্তরা বুঝতে পারছে না…

সাইবার জিহাদ মোকাবেলায় বাঙলাদেশ

একাত্তরের ঘাতক দালাল নির্মূল কমিটি আয়োজিত ওয়েবিনারের ধারণাপত্র বাঙলাদেশের রাজনীতিবিদ, আইনশৃঙ্খলাবাহিনী, প্রশাসন ও নাগরিক সমাজ সকলেই আজ এই মর্মে একমত যে, ধর্মীয় উগ্রপন্থী সংগঠনগুলো গত কয়েক বছরে তাদের অপকর্মের পদ্ধতি পরিবর্তন করেছে। ধর্মকে ব্যবহার করে বাঙলাদেশের উগ্রবাদী জঙ্গীগোষ্ঠীগুলো যে প্রকাশ্য সন্ত্রাসবাদী কার্যক্রম পরিচালনা করে আসছিলো, আইনশৃঙ্খলাবাহিনীর কঠোর তৎপরতার কারণে তার অনেকটাই এখন নিয়ন্ত্রণে চলে এসেছে।…

প্রজন্মের মননে গেরিলা তৎপরতার কলাকৌশল

বই না বলে গেরিলা অপারেশনের ম্যানুয়াল বলাই বরং ভালো— অন্তত আমার বিবেচনায়। তবে এই প্রচেষ্টা সম্মুখসমরে নয়, প্রজন্মের বিভ্রান্তিকর মগজে আর প্রায় ক্ষয়ে-যাওয়া মননের অলিতে-গলিতে। স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তীতে স্বাধীনতা সংগ্রামের ইতিহাস খুঁজতে গেলে আমরা বুঝি, গত পঞ্চাশ বছরে আমাদের পায়ের তলার মাটি কেমন আলগা হয়ে গেছে। নরম পলিমাটির বদলে সেখানে ফাঁদ পেতেছে বিভ্রান্তির চোরাবালি। আশাবাদী অগ্রজেরা…

আদর্শের সমীকরণে রাজনৈতিক লেখচিত্র

বাংলাদেশের সামনে এখন দু’টো গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা। একটি মহাকাব্যিক মুক্তিযুদ্ধের সুবর্ণজয়ন্তী, অন্যটি জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের জন্মশতবর্ষ। বাংলাদেশের রাজনৈতিক সমীকরণ কতটা মুক্তিযুদ্ধের আদর্শের অনুগামী আর কতটুকুই বা তার বিচ্যুতি—, উল্লিখিত দু’টো ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে আমরা তার বিচার করতে পারবো। স্বাধীনতার পঞ্চাশ বছরের ইতিহাসে নানা টানাপড়েনের পরও মুক্তিযুদ্ধোত্তর প্রজন্মের কাছে এই সত্য সুস্পষ্ট যে, বাংলাদেশের আর্থ-সামাজিক…

বিপন্নতাকে কৃষ্ণচূড়ায় পাল্টে ফেলার দশক

বাংলাদেশের সামাজিক-রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক ইতিহাসে গত শতাব্দীর ষাটের দশক এক অবিস্মরণীয় গণজাগরণের দশক। মূলত এই দশকের আলোতেই রচিত হয়েছিল বিংশ শতাব্দীর অলোকসামান্য ঘটনা একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধ। পৃথিবীব্যাপী মুক্তিকামী মানুষের কাছে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ সর্বকালের এক অখণ্ড অনুপ্রেরণা। বাংলার মানুষের মুক্তিসংগ্রামের যে বীজ সাংস্কৃতিক ভূমিতে রোপিত হয়েছিল বিংশ শতাব্দীর প্রথম পর্বে, তার রাজনৈতিক বিকাশ প্রাপ্তির সময় হিসেবে চিহ্নিত…

তৎকালীন সংবাদপত্রে বঙ্গবন্ধুর স্বদেশ প্রত্যাবর্তন

ওই মহামানব আসে… — ১৩৪৮ বঙ্গাব্দের পহেলা বৈশাখ রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর গানটি রচনা করেছিলেন। খ্রিষ্টিয় পঞ্জিকা অনুযায়ী তারিখটি ছিলো— ১৪ এপ্রিল, ১৯৪১— অর্থাৎ রবীন্দ্র প্রয়াণের ঠিক ১১৬ দিন আগে। বিদায় বেলার জানালায় দাঁড়িয়ে ভৈরবী রাগের এই গানটি তবে রবীন্দ্রনাথের ভবিষ্যত-দর্শন? কেননা, গানটি রচনার প্রায় ৩০ বছর পর এর একটি অলৌকিক দৃশ্যায়ন ঘটেছে সদ্য স্বাধীন বাঙলাদেশে। ১৯৭২…

সেই অবিনাশী উচ্চারণ

একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধ যদি একটি মহাকাব্য হয়, তবে তার প্রবেশদ্বার হচ্ছে বঙ্গবন্ধুর ৭ই মার্চের সেই অবিনাশী উচ্চারণ। একটি মুখবন্ধ—যার মধ্যে বাঙালির স্বাধীনতা সংগ্রামের প্রতিটি স্তর-উপস্তর ব্যাখ্যা করা আছে; আছে নির্যাতিত হওয়ার খতিয়ান, নির্দেশনামা, করণীয় এবং অকরণীয়সমূহ। মাত্র ঊনিশ মিনিটের এই পারাবারপ্রতিম ভাষণে জাতির জনক আসলে রচনা করেছিলেন আমাদের স্বাধীনতার সংজ্ঞা, তাকে বিস্তৃত করেছিলেন ‘মুক্তি’র অভিধায়; এবং…

বিপন্নতাকে কৃষ্ণচূড়ায় পাল্টে ফেলার লড়াই

মানবসভ্যতার ইতিহাসে পড়েছি— লৌহ যুগ, তাম্র যুগ, প্রস্তর যুগ, নব্যপ্রস্তর যুগ— গোটা পৃথিবীতে এখন চলছে বিপন্নতার যুগ। এশিয়া, আফ্রিকা, লাতিন আমেরিকা, ইউরোপ…সব, সবটাই যেন বিপন্নতার কালো স্কার্ফে মুড়িয়ে দিয়েছে কোনো এক অন্ধ জাদুকর। সে নিজে অন্ধকার দেখতে পায় না বলে স্বীকার করে না আলোর অস্তিত্ব। ফলে বিপন্নতার রাত্রি ক্রমাগত গাঢ় থেকে গাঢ়তর হচ্ছে। বিপন্নতার এই…

পনেরোই আগস্ট: ষড়যন্ত্রের পথ ধরে জন্ম নেয়া ট্র্যাজিডি

শিরোনামটি শুনে কিছুটা সিদ্ধান্তমূলক মনে হলেও, এই লেখাটি মূলত প্রশ্নমূলক। জাতির জনক বঙ্গবন্ধুকে সপরিবারে হত্যা করা হয় ১৯৭৫ সালের পনেরোই আগস্ট। বাঙালির জাতির ইতিহাসে এর চেয়ে কলঙ্কজনক কোনো অধ্যায় নেই। বাঙালি জাতি যে একটি অকৃতজ্ঞ জাতি পনেরোই আগস্ট তার সবচেয়ে বড়ো প্রমাণ। এই লেখাটি মূলত সংকলনধর্মী। পঁচাত্তরের পনেরোই আগস্ট সেই নৃশংসতম রাত্রির প্রেক্ষাপট তৈরির পেছনে…